Skip to main content

এস এম সুলতান


শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি এস. এম. সুলতান নামে সমধিক পরিচিত, (১০ আগস্ট, ১৯২৩ - ১০ অক্টোবর, ১৯৯৪) বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যেআবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তাঁর শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেতাঁর ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণীর দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছেতাঁর ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৮২ সালে তাঁকে এশিয়ার ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করে
এস. এম. সুলতান ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্টে তৎকালীন পূর্ব বাংলা (বর্তমান বাংলাদেশ) যশোরের নড়াইলের মাছিমদিয়া নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেনতাঁর জন্ম হয়েছিলো এক দরিদ্র পরিবারেতাঁর বাবার নাম শেখ মোহাম্মদ মেছের আলী, তিনি পেশায় ছিলেন রাজমিস্ত্রী শৈশবে পরিবারের সবাই তাকে লাল মিয়া বলে ডাকতোতাঁকে বিদ্যালয়ে পড়ানোর মতো অতোটা সামর্থ্য তাঁর বাবার ছিলো নাবহু কষ্ট হওয়াসত্ত্বেও তাঁকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়তিনি এখানে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেনএরপর স্কুল ছেড়ে বাড়ি ফিরে রাজমিস্ত্রীর কাজ শুরু করেনরাজমিস্ত্রীর কাজ করার পাশাপাশি তিনি সেই দালানগুলোর ছবি আঁকতেন১০ বছর বয়সে যখন তিনি স্কুলে পড়েন তখন ড: শাম্যপ্রসাদ মুখার্জ্জী স্কুল পরিদর্শনে এসে তাঁর আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করেছিলেনতাঁর খুব ইচ্ছা ছিলো ছবি আঁকা শিখবেন, এজন্যে দরকার হলে কলকাতায় যাবেনকিন্তু এরকম আর্থিক সঙ্গতি তাঁর পরিবারের কখনোই ছিলোনাএসময় তাঁর এলাকার জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেনজমিদারের সাহায্য নিয়ে সুলতান ১৯৩৮ সালে কলকাতা যান
তাঁর ইচ্ছা ছিলো কলকাতায় গিয়ে অর্থ উপার্জনের কোনো চেষ্টা করার পাশাপাশি চিত্রশিল্পের শিক্ষা চালিয়ে যাবারএই ইচ্ছা নিয়েই তিনি প্রথমে ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের কলকাতার বাড়িতে উঠেনএসময় তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক এবং কলকাতা আর্ট স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সদস্য শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর পরিচয় হয়সোহরাওয়ার্দী, সুলতানকে সব ধরণের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেনতাঁর গ্রন্থাগার সুলতানের জন্য সব সময় উন্মুক্ত ছিলো ১৯৪১ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হনভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা না থাকাসত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দীর চেষ্টায় তিনি ভর্তি হতে পেরেছিলেনএখানে তিনি তিন বছর পড়াশোনা করেনপাশ করে একজন ফ্রিল্যান্স চিত্রশিল্পী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন
আর্ট স্কুলে পড়লেও সেখানকার বাঁধাধরা জীবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার কঠোর রীতিনীতি তাঁর জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলোনাতিনি ছিলেন বোহেমীয় জীবনাচারের অনুসারীচেতনায় তিনি ছিলেন স্বাধীন এবং প্রকৃতিগতভাবে ছিলেন ভবঘুরে এবং ছন্নছাড়াপ্রকৃতিকে তিনি সবসময় রোমান্টিক কবির আবেগ দিয়ে ভালোবেসেছেনআবার যান্ত্রিক নগর জীবনকে সেরকমই ঘৃণা করেছেন ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেনএর অব্যবহিত পরেই বেরিয়ে পড়েন এবং উপমাহাদেশের পথে পথে ঘুরে তাঁর অনেকটা সময় কেটে যায়তখন ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়অনেক মার্কিন ব্রিটিশ সৈন্য ছিলো ভারতেতিনি ছোট-বড় বিভিন্ন শহরে ঘুরে ঘুরে ছবি এঁকে তা সৈন্যদের কাছে বিক্রি করতেনএভাবেই তিনি সেসময় জীবনধারণ করেছেনমাঝে মাঝে তাঁর ছবির প্রদর্শনীও হয়েছেএর মাধ্যমে তিনি শিল্পী হিসেবে কিছুটা পরিচিতি লাভ করেনকিন্তু সুলতানের চরিত্রে পার্থিব বিষয়ের প্রতি যে অনীহা এবং যে খামখেয়ালীপনা ছিলো তাঁর কারণে সেই ছবিগুলো রক্ষা করা সম্ভব হয়নিসেগুলোর কোনো আলোকচিত্রও এখন পাওয়া যায় নাএছাড়া তিনি কখনও এক স্থানে বেশি দিন থাকতেন না

 তবে এটুকু জানা গেছে যে, সেসময় তিনি প্রাকৃতিক নৈসর্গ্য এবং প্রতিকৃতি আঁকতেনতাঁর আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিলো ১৯৪৬ সালে সিমলায়
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ভারতের জন্ম হয়এই বিভক্তির পর এস এম সুলতান কিছু দিনের জন্য নিজ দেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেনএখানে কিছুদিন থেকেই করাচি চলে যানসেখানে পারসি স্কুলের শিল্প শিক্ষক হিসেবে দুই বছর চাকুরি করেছিলেনসেখানে চাকুরিরত থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে পরিচয় হয় চুঘতাই এবং শাকের আলীর মত বিখ্যাত শিল্পীদেরএর কিছু আগে ১৯৫০ সালে চিত্রশিল্পীদের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যানসেখানে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো এবং বোস্টনে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়এরপর লন্ডনেও তিনি প্রদর্শনী করেছিলেন ১৯৫৩ সালে আবার নড়াইলে ফিরে আসেনএবার এসে তিনি শিশু শিক্ষার প্রসারে কাজ শুরু করেন যা নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিলোশেষ বয়সে তিনি নড়াইলে শিশুস্বর্গ এবং চারুপীঠ নামে দুটি শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় তুলেছিলেনএছাড়া সেখানে "নন্দন কানন" নামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং "নন্দন কানন স্কুল অব ফাইন আর্টস" নামেএকটি আর্ট স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন
অনেকটা সময় তাঁর নড়াইলেই কেটে যায়ঢাকায় আধুনিক চিত্রশিল্পের বিকাশের সময়টায় তিনি প্রায় সকলের অজ্ঞাতেই ছিলেন ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি শিল্পরসিকদের চোখের আড়ালেই থেকে যানসত্তরের দশকের মধ্যভাগে তাঁর কিছু শুভানুধ্যায়ী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেনএখানে এসে তিনি কিছু ছবি আঁকেনতাঁর আঁকা এইসব ছবি নিয়ে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেএই প্রদর্শনীর মাধ্যমেই তিনি নতুন করে শিল্পসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনঅবশ্য আশির দশক থেকে তিনি আবার নড়াইলেই থাকতে বাধ্য হোনতাঁর কাছে যেসব মানুষ এবং শিশু আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের জন্য তিনি নিজের ঘর ছেড়ে দেনজীবজন্তুর প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি একটি চিড়িয়াখানা তৈরি করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে শিশুদের জন্য সুন্দরী কাঠ দিয়ে একটি বড় আকারের নৌকাও তৈরি করেছিলেনতাঁর ইচ্ছা ছিলো শিশুরা সেই নৌকায় চড়ে সমুদ্র পরিভ্রমণে বের হবে আর শিল্পচর্চার উপকরণ খুঁজে পাবে আশির দশকের শেষদিকে তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোনে তাঁর সর্বশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়সে বছরেরই আগস্ট মাসে নড়াইলে ঘটা করে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয় 
১৯৯৪ সালেরই ১০ আগস্ট তিনি যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন

Comments

Popular posts from this blog

মুনির চৌধুরী

আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী (জন্ম:২৭শে নভেম্বর, ১৯২৫ - মৃত্যু:১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১) একজন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী। তিনি তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানাধীন গোপাইরবাগ গ্রামে। তিনি ছিলেন ইংরেজ আমলের সরকারী কর্মচারী খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরীর চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। কবীর চৌধুরী তাঁর অগ্রজ, ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর অনুজা। মুনীর চৌধুরী ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (বর্তমান ঢাকা কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং ১৯৪৩ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স (১৯৪৬) এবং মাস্টার্স (১৯৪৭) পাস করেন, উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র। বক্তৃতানৈপুণ্যের সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের প্রথম বছরেই, ১৯৪৩ সালে, হলের সেরা বক্তা হিসেবে প্রোভোস্ট্‌স কাপ জেতেন। ১৯৪৬ সালে নিখিল বঙ্গ সাহিত্য প্রতিযোগিতায় সর্বাধিক সংখ্যক পুরস্কার জেতেন...

মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা

মুহম্মদ কুদরাত-এ-খুদা   বা   ড. কুদরাত-এ-খুদা   ( ডিসেম্বর ১ ,   ১৯০০   -   নভেম্বর ৩ ,   ১৯৭৭ ) ছিলেন একজন বাংলাদেশী   রসায়নবিদ , গ্রন্থকার এবং শিক্ষাবিদ । কুদরাত-এ-খুদা   ১৯০০   সালের ১   ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের   বীরভূমের মাড়গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেম । তার পিতা   খোন্দকার আব্দুল মুকিদ , মাতা   ফাসিহা খাতুন । আলচনাঃ  ড. কুদরাত-এ-খুদার শিক্ষাজীবন শুরু হয় মাড়গ্রাম এম.ই. স্কুলে । পরবর্তীতে তিনি চলে আসেন কলিকাতা উডবার্ন এম.ই. স্কুলে এবং   কলিকাতা মাদ্রাসায় । কলিকাতা মাদ্রাসা থেকে তিনি   ১৯১৮   সালে ম্যাট্রিক পাশ করেন । তারপর তিনি ভর্তি হন বিখ্যাত   প্রেসিডেন্সি কলেজে । সেখান থেকেই তিনি১৯২৫   সালে   রসায়নে   প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এস.সি পাশ করেন । পাশ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে   ইংল্যান্ড   পাড়ি জমান ।   লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়   হতে   Stainless Configuration of Multiplanmet Ring   বিষয়ে   গবে...

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

                                           জাহানারা ইমাম জন্ম মে ৩ , ১৯২৯ মুশিদাবাদ , বতর্মান   পশ্চিমবঙ্গ মৃত্যু জুন ২৬ , ১৯৯৪ (৬৫   বছর) ঢাকা মৃত্যুর কারণ ক্যান্সার বাসস্থান বাংলাদেশ   অন্য নাম শহীদ জননী পেশা শিক্ষকতা যে জন্য পরিচিত সাহিত্যিক ও একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল আন্দোলনের নেত্রী ধর্ম ইসলাম আলচনাঃ   জাহানারা ইমাম   ( জন্ম:   মে ৩ ,   ১৯২৯   - মৃত্যু:জুন ২৬ ,   ১৯৯৪ ) একজন   বাংলাদেশী   লেখিকা , শহীদ জননী , কথাসাহিত্যিক , শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী । তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ   একাত্তরের দিনগুলি । একাত্তরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র   শফি ইমাম রু...